ইঞ্জিনিয়ারিং কোড রুলস
বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়াতে এবং কাজের সঠিক স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে বিএনবিসি (BNBC 2020) গাইডলাইন মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। সাবস্টেশন ডিজাইন, ওয়্যারিং, প্যানেল বোর্ড ও আর্থিং-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ৪০টি ইঞ্জিনিয়ারিং কোড রুলস সহজ ভাষায় জেনে নিন এই ব্লগে।


আমাদের দেশে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়াতে এবং কাজের একটি স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC 2020) এবং অন্যান্য ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। আজকের ব্লগে আমি আপনাদের সাথে এমন কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং কোড রুলস শেয়ার করব, যা নবীন ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে প্রফেশনাল ডিজাইনার—সবারই দৈনন্দিন কাজে লাগবে। চলুন, নিয়মগুলো একটু সহজ ভাষায় জেনে নিই!
১. সাবস্টেশন ডিজাইন (Substation Design)
যেকোনো বড় স্থাপনার প্রাণকেন্দ্র হলো সাবস্টেশন। এটি স্থাপনের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট মাপজোক মেনে চলা বাধ্যতামূলক:
- রুমের উচ্চতা: সাবস্টেশন রুমের ভেতরের উচ্চতা ফ্লোর লেভেল থেকে অবশ্যই ৩ মিটার থেকে ৩.৬ মিটারের মধ্যে হতে হবে।
- সাবস্টেশন ইনস্টলেশন: বিএনবিসি ২০২০ (BNBC 2020) অনুযায়ী, কোনো বিল্ডিং-এর লোড ৫০ কিলোওয়াট এর বেশি হলে গ্রাহককে নিজ খরচে সাবস্টেশন বসাতে হবে (তবে সংশোধিত গ্যাজেট অনুযায়ী বর্তমানে এটি ৮০ কিলোওয়াট)।
ট্রান্সফর্মারের দূরত্ব:
- ১১ কেভি (11 kV) ভোল্টেজ লেভেলের একাধিক ট্রান্সফর্মার পাশাপাশি থাকলে একটি থেকে আরেকটির দূরত্ব ন্যূনতম ১.৫ মিটার হতে হবে।

- আর ৩৩ কেভি (33 kV) ভোল্টেজের ক্ষেত্রে এই দূরত্ব হবে অন্তত ২.৫ মিটার।
- সোক পিট (Soak Pit): অয়েল (Oil) টাইপ ট্রান্সফর্মারে যদি ২০০০ লিটার বা তার বেশি তেল থাকে, তবে লিকেজ বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে এর নিচে একটি আরসিসি (RCC) সোক পিট বা ড্রেন সিস্টেম তৈরি করতে হবে।
- লোড ফ্যাক্টর: সাবস্টেশন ডিজাইন করার সময় টোটাল কানেক্টেড লোডের ৮০% (80%) লোড ফ্যাক্টর হিসেবে ধরে ক্যালকুলেশন করতে হবে।
২. জেনারেটর রুম (Generator Room)
জেনারেটর রুমের সেফটি এবং চলাচলের সুবিধার জন্য ক্লিয়ারেন্স রাখা খুব জরুরি:
- ওয়ার্কিং ক্লিয়ারেন্স: একই রুমে একাধিক জেনারেটর থাকলে একটি থেকে অন্যটির মাঝে ন্যূনতম ১.২৫ মিটার দূরত্ব থাকতে হবে।
- বদ্ধ রুমের ক্ষেত্রে: যদি বদ্ধ রুমে একটি মাত্র জেনারেটর থাকে, তবে রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধার্থে তার চারপাশে ১ মিটার ওয়ার্কিং ক্লিয়ারেন্স বা হাঁটার জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে।
৩. কেবল এবং ওয়্যারিং (Cables & Wiring)
ভুল ওয়্যারিং শর্ট সার্কিটের প্রধান কারণ। তাই এই নিয়মগুলো খেয়াল রাখুন:
- কেবলের দূরত্ব: টেলিকমিউনিকেশন (ইন্টারনেট/ডিশ) কেবল এবং ইলেকট্রিক্যাল কেবল কখনোই একই পাইপের ভেতর দিয়ে নেওয়া যাবে না। দুটি কন্ডুইটের মাঝে ন্যূনতম ৩৫০ মিলিমিটার (350mm) দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
- নিউট্রাল কমন করা: খরচ বাঁচাতে অনেকেই একাধিক সার্কিটের জন্য একটি নিউট্রাল তার কমন বা লুপিং করে ফেলেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। প্রতিটি নির্দিষ্ট সার্কিটের জন্য ডেডিকেটেড নিউট্রাল তার ব্যবহার করতে হবে।
- ফেজ ও নিউট্রাল সাইজ: ফেজ এবং নিউট্রাল কেবল সবসময় একই সাইজের হতে হবে (যেমন- ফেজ তার ২.৫ আরএম হলে, নিউট্রাল তারও ২.৫ আরএম হতে হবে)।
- আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল: এলটি (LT) আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনের ক্ষেত্রে অবশ্যই NYY টাইপের (ডাবল পিভিসি ইনসুলেশন যুক্ত) কেবল ব্যবহার করতে হবে।
৪. প্যানেল ও ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড (Panel Boards)
- সামনের ফাঁকা জায়গা: জরুরি অবস্থায় কাজ করার সুবিধার্থে প্যানেল বোর্ডের সামনে ন্যূনতম ১ মিটার (৩ ফিট) জায়গা সম্পূর্ণ ফাঁকা রাখতে হবে।
- উভয় দিকে প্যানেল থাকলে: হাঁটার রাস্তার দুইদিকেই যদি প্যানেল বোর্ড থাকে, তবে মাঝখানের ক্লিয়ারেন্স হবে ন্যূনতম ৪ ফিট।
- মাউন্টিং হাইট (উচ্চতা): দেয়ালে লাগানো প্যানেল বোর্ড ফ্লোর থেকে ন্যূনতম ০.৪৫ মিটার উপরে বসাতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সার্কিট ব্রেকার বা গ্রিপটি যেন কোনোভাবেই ২ মিটারের বেশি উঁচুতে না হয়, যাতে জরুরি অবস্থায় যে কেউ সহজেই হাত বাড়িয়ে সেটি অফ করতে পারে।
- সিল করা (Sealing): প্যানেলে কেবল ঢোকানোর পর যে ফাঁকা জায়গাগুলো থাকে, সেগুলো ফায়ার রেটেড ফোম বা সিলিকা দিয়ে ভালোভাবে বন্ধ করে দিতে হবে। এতে ইঁদুর বা পোকামাকড় ঢুকে শর্ট সার্কিট ঘটাতে পারবে না।
৫. সুইচ এবং সকেট (Switches & Sockets)
- সুইচবোর্ডের উচ্চতা: * বাসাবাড়ির ক্ষেত্রে সুইচবোর্ড ফ্লোর থেকে ১২০০ মিলিমিটার উঁচুতে বসাতে হবে।
- কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে এটি হবে ১৩০০ মিলিমিটার।
- পাওয়ার সকেটের তার: ১৫ অ্যাম্পিয়ার পাওয়ার সকেটের জন্য ৪ আরএম (4 RM) কেবল ব্যবহার করতে হবে। তবে সার্কিটের দূরত্ব যদি ৩০ মিটার (১০০ ফিট) এর বেশি হয়, তবে ভোল্টেজ ড্রপ এড়াতে ৬ আরএম (6 RM) কেবল ব্যবহার করতে হবে।
- আর্থিং তার (ECC): প্রতিটি সকেটে অবশ্যই আর্থিং তারের সংযোগ থাকতে হবে এবং এর সাইজ ন্যূনতম ১.৫ এমএম স্কয়ার হতে হবে।
- সকেটের উচ্চতা: ফ্লোর লেভেলের কাছাকাছি যেসব সকেট থাকে, সেগুলো ফ্লোর থেকে ২৫০ মিলিমিটার (প্রায় ১০ ইঞ্চি) উপরে বসাতে হবে। কোনোভাবেই এটি স্কার্ট লেভেলের (Skirting) নিচে বসানো যাবে না।
- আননোন লোড (Unknown Load): সকেট যদি নির্দিষ্ট কোনো মেশিনের জন্য নির্ধারিত না হয় (অর্থাৎ সাধারণ ব্যবহারের জন্য), তবে সেটির পাওয়ার লোড ১ কিলোওয়াট (১০০০ ওয়াট) ধরে ডিজাইন করতে হবে।
৬. লাইটিং ও ভোল্টেজ (Lighting & Voltage)
- লাইটের দূরত্ব: একটি লাইট থেকে আরেকটি লাইটের দূরত্ব ন্যূনতম ২ থেকে ৩ মিটার হওয়া আদর্শ, তবে এটি আপনার স্পেসিফিক লাইটিং ডিজাইনের ওপর নির্ভর করবে।
- ইমারজেন্সি ব্যাকআপ: যেকোনো বিল্ডিংয়ে এক্সিট সাইন (Exit Sign) এবং ইমারজেন্সি লাইটগুলো এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যেন মূল বিদ্যুৎ চলে গেলেও সেগুলো ন্যূনতম ৩০ মিনিট পর্যন্ত একটানা জ্বলতে পারে।
- ভোল্টেজ ড্রপ: সোর্স থেকে লোড ডেস্টিনেশন পর্যন্ত লাইনে ভোল্টেজ ড্রপ কোনোভাবেই সাপ্লাই ভোল্টেজের ২.৫% এর বেশি হওয়া যাবে না।
- উজ্জ্বলতা (Lux Level): সাধারণ কাজের জায়গায় (Working area) লাইটের উজ্জ্বলতা ন্যূনতম ১৫০ লাক্স (150 Lux) থাকতে হবে, যাতে চোখের ওপর চাপ না পড়ে।

৭. আর্থিং এবং সেফটি টেস্ট (Earthing & Safety)
- আর্থ ইলেকট্রোড: মাটির নিচে থাকা আর্থিং এর রডটি (ইলেকট্রোড) অন্তত ১০ ফিট লম্বা হতে হবে এবং এর ডায়ামিটার হবে ১২.৫ বা ১২.৭ মিলিমিটার।
- আর্থিং রেজিস্ট্যান্স: একটি নিরাপদ সিস্টেমের জন্য আর্থিং এর ভ্যালু ১ ওহম (1 Ohm) এর নিচে রাখতে হবে। এলপিএস (LPS) এর ক্ষেত্রে সাধারণ ভবনে ১০ ওহম এবং ১০ তলার বেশি হাইরাইজ বিল্ডিং-এ ২ ওহম এর মধ্যে থাকতে হবে।
- আর্থিং টেস্ট: আর্থিং সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে অন্তত ১ বা ২ বছর পরপর একবার টেস্ট করা উচিত।
- থার্মোগ্রাফি স্ক্যান টেস্ট: প্যানেল বা ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেমে কোথায় ওভারহিট হচ্ছে তা জানার জন্য বছরে অন্তত দুইবার (ছয় মাস পরপর) থার্মোগ্রাফি স্ক্যান করা উচিত। টেস্ট করার সময় সিস্টেমে ন্যূনতম ৪০% লোড কানেক্টেড থাকতে হবে, নইলে সঠিক রিডিং পাওয়া যাবে না।
শেষ কথা
আশা করি, এই গাইডলাইনগুলো আপনাদের ইলেকট্রিক্যাল প্রজেক্ট ডিজাইন এবং বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে অনেক সাহায্যে আসবে। ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিজাইন শুধু খাতা-কলমের হিসাব-নিকাশ বা সুন্দর থ্রিডি মডেল নয়, এটি একটি বিশাল দায়িত্ব। সঠিক কোড মেনে ডিজাইন করলে শুধু আইনই মানা হয় না, বরং অনেক মানুষের জীবন ও মহামূল্যবান সম্পদ রক্ষা পায়।
এই রুলসগুলো নিয়ে আপনাদের কোনো প্রশ্ন থাকলে বা আপনাদের প্রজেক্টের কোনো অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাইলে নিচে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। আমি চেষ্টা করব উত্তর দেওয়ার।
সবাই ভালো থাকবেন, সেফটি ফার্স্ট মাথায় রেখে নিরাপদে কাজ করবেন!
— শাহিন (Sahin) ইঞ্জিনিয়ার ও ডিজাইনার [sahinalom.com]
